উত্তর পাওয়াই জরুরী

আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে সব সময়ই তথ্য পাওয়া; ‘বিজয়ী’ হওয়া নয়। একটা ঠান্ডা ও শান্তশিষ্ট অবস্থান নিন। আপনার যতটা প্রয়োজন ততটা সময় নিন। সাক্ষাৎকারের কৌশল সব সময়ই হওয়া উচিৎ তথ্য ও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া। আপনার প্রশ্নমালা হচ্ছে একটা লক্ষ্য অর্জনের একটা উপায়। যেকোনো ধরণের আবেগের বহিপ্রকাশ (ভ্রু কোঁচকানো, কাঁধ ঝাঁকানো, মৃদু হাসি) দিলেই তা আপনার সূত্র বুঝতে পারবেন। আপনি একজন মানুষ। আপনার সাড়াতে তার প্রতিফলন থাকতে পারে। আর টিভিতে প্রতিক্রিয়াহীন মুখায়বয়ব বিরক্তিকর দৃশ্য তৈরি করে। কিন্তু সতর্ক থাকুন এবং সীমাটা জেনে নিন। হঠাৎ প্রকাশিত কোনো উচ্ছ্বাস সূত্রকে মনে করিয়ে দিতে পারে যে তাঁর বলা শব্দগুলো ‘অন ট্রায়াল’ রয়েছে। তিনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর সজাগ হয়ে উঠতে পারেন। কোনো বিষয়ে উষ্কানি মোড় নিতে পারে নাটকীয় দ্বন্দ্ব-বিরোধ বা নিস্ফল বর্জনে। আপনার আগ্রাসী আচরণ এতটাই অনুপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে যে, এর কারণে আপনাকে দেখতে খুবই খারাপ লাগতে পারে। আপনার সাড়াটা যে ইচ্ছাকৃত সেটা বুঝতে দিন; স্বতস্ফূর্ত নয়। মনে রাখুন, কেউ যদি কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়, তাহলে তার সুযোগ নিয়ে সে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে বেঁচে যেতে পেতে পারে।

আসল বিষয়ে যান

আপনার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের চেয়ে সূত্রের উত্তরগুলোর গুরুত্ব বেশি। সুতরাং প্যাঁচাবেন না এবং হঠাৎ হঠাৎ বাধা দেবেন না। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক বা ব্যবসায়ী হয়তো শত শত বা হাজারো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাঁদের সময়টা অত্যন্ত মূল্যবান। তাঁরা যদি একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান, সেটা তাঁরা করবেনই। তাঁরা এটা বোঝেন যে, তাঁরা যেসব সমস্যা সৃৃষ্টি করেছেন সেটা যদি আপনি প্রকাশ করে দেন তাহলে তাঁদের মুখ থাকবে না; অবস্থান ও অর্থ দুটোই হারাবেন। এমনকি মাঝেমধ্যে পুরো ক্যারিয়ারই নষ্ট হতে পারে। পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা ভালোভাবে বুঝে নিন। যদি দেখা যায় নরম বা নমনীয় প্রশ্ন কাজে আসছে না, তাহলে সোজাসুজি বলে ফেলুন। যদি তাঁদের জবাবটা সহজে বোধগম্য না হয়, তাহলে ঢেলে সাজিয়ে ভিন্নভাবে প্রশ্নটি করুন এবং আবার চেষ্টা করুন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সূত্রের চিন্তার জন্য সময় প্রয়োজন হয় এবং আরেকবার উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলে তাঁরা খুশি হন। সব জবাব সতর্কতার সঙ্গে শুনুন – আপনার জবাব সত্যিই কি পেয়েছেন?। আপনার সূত্র যা বলছে, আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা পেয়েছেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে আপনি সেই উত্তরটা তাঁদেরই আবার শুনিয়ে দিতে পারেন (যেমন, আপনি যেটা বলতে চাইছেন, তা হচ্ছে…)।

পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে যা করতে হবে

আপনার সূত্র যখন যথোপযুক্ত উত্তর দিতে চান না, তখন তিনি ‘সম্প্রতি’, ‘কয়েকটি’, ‘অনেক’, ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। এমন ক্ষেত্রে আপনাকে ফলো-আপ প্রশ্ন করতে হবে, যা অধিকতর সুনির্দিষ্ট উত্তর বের করে আনবে। যেমন, ‘কখন?’, ‘কতগুলো?’, ‘আপনি কী সংখ্যাটা আন্দাজ করতে পারেন?’ অথবা ‘ঠিক কী করবেন?’।
বদ্ধ প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা। সাক্ষাৎকারদাতা হয়তো একটা প্রশ্নে লাইন টেনে দিতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেবেন। কখনো কখনো আপনার তার চেয়ে বেশি তথ্য লাগবে। তখন সেই প্রশ্নে আবার ফিরতে হবে; যেমন,

‘আপনি কি চুক্তিটা সই করেছেন?’
‘হ্যাঁ’।
‘এটা করার ক্ষেত্রে আপনার উদ্দেশ্যটা কী একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন?’

প্রতিটি প্রশ্নের জবাব সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করার পরই পরবর্তী প্রশ্নে যান। দক্ষ সাক্ষাৎকারদাতারা হয়তো এমনভাবে সব উত্তর দেবেন, যাতে মনে হতে পারে আপনি এটাই শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, যখন আপনি পুনরায় আপনার নোটগুলো পড়বেন, তখন হয়তো আপনি দেখতে পাবেন যে তাঁরা ধোকা দিয়ে আপনার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন।

আপনি প্রশ্ন করলেন: ‘আপনি কী …জেলার ক্লিনিকে ওষুধগুলো পাঠিয়েছিলেন?’
তাঁরা উত্তর দেবেন, ‘অবশ্যই, ওই ক্লিনিকের জন্য সব ধরনের উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।’

এখানে ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর রয়েছে। কিন্তু আপনি সরাসরি যে প্রশ্নটা করলেন, তার সঠিক জবাব এখানে নেই। আপনাকে তখন ফলোআপ প্রশ্ন করতে হবে: ‘কী কী ওষুধ পাঠিয়েছেন?’ কোন তারিখে সেগুলো পাঠানো হয়েছে?’ সেগুলো যে পাঠানো হয়েছে, এ বিষয়ে আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে?’ ‘সেগুলো যে পৌঁছেছে, এ বিষয়েই বা আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?’ আপনি যদি সূত্রের কোনো উত্তর বুঝতে না পারেন, সেটি তাঁকে বলুন। বোঝার ভান করার চেয়ে আপনি যে পরিস্কার বুঝতে পারেননি সেটা স্বীকার করা ভালো। আপনি বলতে পারেন, ‘আমাদের পাঠকেরা/দর্শকেরা এটা হয়তো বুঝতে পারবেন না। এটা কী আরও সহজভাবে আপনি আবার ব্যাখ্যা করবেন?’ তা না হলে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করার কৌশল প্রয়োগ করুন: ‘মন্ত্রী মহোদয়, আমি যদি আপনার কথা সঠিকভাবে বুঝে থাকি, তাহলে আপনি বলতে চাইছেন …। আসলেই কী তাই?’

কাগজ ঘাটাঘাটি ও রেফারেন্স দেওয়া

সাক্ষাৎকারের সময় আপনার কাছে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রেসবিজ্ঞপ্তি, নথিপত্র গবেষণা-সমীক্ষা বা ছবির কপি আছে কি না নিশ্চিত হয়ে নিন। সাক্ষাৎকারদাতা অপ্রত্যাশিত কিছু বলতে পারেন। এমন ক্ষেত্রে আপনি ওই সব নথিপত্র থেকে রেফারেন্স দিতে পারেন। আপনারা টেপ রেকর্ডার ও মাথা দুটোই সচল রাখুন। আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এগুলোর রেকর্ড ধারণ করা থাকবে। উপযুক্ত মনে হলে, ফলোআপ প্রশ্ন করার জন্য অনুমতি চাইতে হবে।

তোষামোদে ভুলবেন না

এটা একটা সাক্ষাৎকার, বন্ধুত্ব নয়। তথ্য আবিষ্কার করতেই আপনি এখানে এসেছেন; কারো পৃষ্ঠপোষকতা পেতে নয়। কেউ হয়তো আপনাকে বলবেন: “এটা দারুণ একটা প্রশ্ন”। এর মাধ্যমে তিনি আপনাকে সম্মান দিচ্ছেন না। বরং, উত্তর খুঁজতে বা ভাবতে কিছুটা সময় বের করে নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারের পর সূত্রকে অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ করে দিন। আশ্চর্য হবেন, কিন্তু এখান থেকেও নতুন কিছু জানা যায়। এরপর প্রশ্ন করুন, আপনার কাছে তাঁর কিছু জানার আছে কিনা। এটাও এক ধরনের সৌজন্যতা। আবার, কীভাবে কখন স্টোরিটা প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়টা তাঁর কাছে ব্যাখ্যা করার ও একটা সুযোগ। সবসময়ই এই প্রশ্নটা দিয়ে সাক্ষাৎকার শেষ করুন: “কিছু কি বাদ পড়েছে?” অথবা “এমন কিছু আছে যা আপনি যোগ করতে চান?”

শেষ সময়ের সৌজন্য

সাক্ষাতকারের শেষ বেলায় প্রায়ই দেখা যায়, সূত্র অধিকতর সাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন। তিনি অনেক খোলাসা হয়ে উঠেছেন। এই সময়টার সদ্ব্যবহার করুন। সাক্ষাৎকারের সময় কোনো পরিভাষা, শিরোনাম বা নাম আসলে সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করে নিন। পরবর্তীতে কোনো তথ্যের বিষয়ে পরিস্কার হওয়া লাগতে পারে। এ জন্য ফোন নম্বর, ইমেইল ঠিকানা ইত্যাদি চেয়ে নিন। আপনার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য বা আপনার কার্ড তাঁকে দিন। শেষ সময়ের সৌজন্যতাকে কখনোই অবজ্ঞা করবেন না। সময় দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আপনি যদি অপদস্থ/অপমানিত হন, তবুও। এমনভাবে কথা বলুন যেন তিনি বুঝতে পারেন যে আপনার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হওয়ার বিষয়টিকে আপনি সত্যিই প্রশংসা করছেন।

এই সাক্ষাৎকারটি যদি ঘটনার প্রেক্ষাপট তথ্য পাওয়ার জন্য হয়ে থাকে অথবা ভাবটা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে আপনি সূত্রের কাছে জানতে চাইতে পারেন যে তিনি অন্য কোনো সূত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিতে পারেন কি না, যার কাছে ঘটনার বিষয়ে বাড়তি অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যেতে পারে। এই ব্যক্তির নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে হয়তো আপনার সামনে নতুন দরোজা উন্মোচিত হবে।

প্রতিশ্রুতি

সাক্ষাৎকার শেষে সরঞ্জাম গোছানোর সময় বা বিদায় নেওয়ার সময়ে বেখেয়াল হয়ে এমন কোনো সুযোগ তৈরি করবেন না যাতে সাক্ষাৎকারদাতা পরে দাবি করতে পারেন যে স্টোরি প্রকাশ প্ওায়ার আগে তাঁকে সেটা দেখতে দিতে আপনি রাজি হচ্ছেন। এ ধরনের আলাপ উঠলে বিষয়টি পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন: “না, আসলে তা নয়। প্রকৃতপক্ষে আমি বলবো, আপনি যদি আলোচনা করতে চান, তাহলে আমার সম্পাদকের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ করা উচিত।” তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য আপনাকে দিচ্ছি।” গণমাধ্যম বোঝেন এমন ব্যক্তিরা শেষ মুহূর্তে এধরণের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। সুতরাং, আপনি আচমকা ফাঁদে পা দেওয়ার বিষয়ে সজাগ থাকুন!

সাক্ষাৎকারের পরপরই নোটগুলো যাচাই করুন

সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পরপরই আপনার নেওয়া নোটগুলো পুনরায় পড়ে নিন। আপনার স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর এটাই উপযুক্ত সময়। আপনি যদি পরবর্তী দিনের জন্য নোটগুলো ফেলে রাখেন, তাহলে হয়তো অনেক কিছুই ভুলে যাবেন, বিশেষ করে সংক্ষেপে বা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের মাধ্যমে যেসব তথ্য লিখে রেখেছেন সেগুলো। দ্বিতীয়বারের মত যাচাই করা তখনই জরুরি। আপনার নোটের শূন্যস্থাণগুলো পূরণ করে নিন এবং কোন জায়গায় ফলোআপ সাক্ষাৎকার দরকার হতে পারে, তা ঠিক করে নিন।