অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাওয়ার পেছনে সাক্ষাৎকারদাতার অনেক যৌক্তিক কারণ থাকে। অনেক দেশেই, ‘অবিশ^স্ত’ সংবাদমাধ্যম ও তাদের এমন তথ্যদাতারা হয়রানির বা আরো খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তা ছাড়া, আপনি যাদের সাক্ষাৎকার নিতে চাইছেন, তাঁরা হয়তো একটা মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অনীহা থাকতে পারে। অথবা তাঁরা যেসব একান্ত তথ্য প্রকাশ করলে নিজস্ব জনগোষ্ঠীর ভেতরে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় থাকতে পারে। মৃদু অধ্যাবসায় হয়তো কখনো কখনো কাজে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, আপনি যদি কাউকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন। সেটা করতে পারলে অনাগ্রহী একজন সূত্রও কথা বলতে রাজি হতে পারেন।

সূত্র কিসে ভয় পান, সেটা আগে খুঁজে বের করুন। সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়ে তাঁকে যতটা সম্ভব আপনি আশ্বস্ত করুন। এর অর্থ হতে পারে, তাঁকে কী ধরনের সুরক্ষা দেওয়া যাবে, সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে সে বিষয়ে আপনার সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া। কারণ, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি আপনার দেওয় া উচিত নয়, যা আপনি পরে রাখতে পারবেন না।

প্রকাশের জন্য সজ্ঞান সম্মতি নিন

‘সজ্ঞান সম্মতি’ একটা গভীরতর বিষয়। এটা নেহায়েৎ আপনার সূত্রকে এই প্রশ্নটি করে নেওয়া নয় যে, “আপনি যা বললেন তা যদি আমরা প্রকাশ করি, তাতে আপনার কোনো আপত্তি আছে কি না?” এর অর্থ, আপনার সূত্র তা প্রকাশের সম্ভাব্য পরিণতি ও ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি এটাও বুঝতে পেরেছেন যে, আপনার প্রদত্ত সুরক্ষাগুলো কাজে দিতে পারে (আবার নাও পারে)। তিনি এগুলো পুরোপুরিভাবে জ্ঞাত হয়েই তা প্রকাশে সম্মতি দিয়েছেন। মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবেন না। তবে সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়টিও তাঁদের কাছে লুকাবেন না। মানুষজন যতবেশি তথ্য দেবে এবং তা প্রকাশের বিষয়ে সম্মতি দেবে, আপনার প্রতিবেদন তত বেশি শক্তিশালী হবে। এ ধরনের আলাপচারিতা সূত্রের সঙ্গে আপনার সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে সহায়তা করবে এবং তাতে আরও বেশি ফলদায়ক আলাপচারিতা পাবেন। যদি কিছু পরিচয় গোপনও করতে হয়, তারপরও এটা কাজে দেবে।

সহমর্মিতা নয়, সহানুভূতি

“ওহ, কতটা ভয়ংকর। আপনার এমন খারাপ অবস্থা”। এমন কথা কখনো বলবেন না। এ ধরনের কথা আপনার সূত্রের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাবে। তিনি হয়তো তখন দূর্বল ও অসহায় বোধ করবেন। সাক্ষাৎকারদাতাকে তার কাহিনীটা বলার জন্য একটা নিরাপদ জায়গা করে দিন। যেটা দরকার সেটা হচ্ছে, একটা নিরপেক্ষ, খোলাখুলি শোনার ধরণ ও যথেষ্ট সময়, যাতে করে সেই ব্যক্তি চিন্তা করার সময় পায় এবং নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নিয়মিতভাবে উৎসাহমূলক সাড়া দিন। সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলুন, “ঠিক আছে, বলুন…”, অথবা “আমাকে আরও কিছু বলুন”। সংস্কৃতিগতভাবে যদি উপযুক্ত হয় তাহলে, সেই ব্যক্তির বাহু মৃদু চাপড়ে দিয়ে আশ্বস্ত করতে কোনো দোষ নেই। এককথায়, আপনার মানবিক প্রবৃত্তি অনুসারে আপনি চলবেন।

লেখা থামান

আপনার সূত্র হয়তো একনিবিষ্ট মনে কথা বলছেন। এর ভেতরেই আপনি নোট নিয়ে চলেছেন। এটা মাঝেমধ্যে সূত্রের কাছে খারাপ লাগতে পারে। প্রশ্নমালা যদি সংবেদনশীল জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, তাহলে কেবলই শুনতে থাকুন। আপনি পরেও নোট লিখতে পারবেন।

শ্রদ্ধা দেখান

তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করে যাবেন না। সূত্রের কোনো উত্তরকে উত্তেজনার্পূণ করে তোলার মাধ্যমে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। সব সময় আপনি সূত্রের আয়নায় নিজেকে দেখবেন। এটা নিশ্চিত করুন যে আপনার প্রশ্নগুলো অসংবেদনশীল নয়।

কঠোর হোন

আপনি সংবেদনশীলতা মাথায় অবশ্যই রাখবেন। কিন্তু এরপরও আপনাকে কঠিন কঠিন সব প্রশ্ন করতে হবে। কেউ হয়তো আপনাকে বলবেন যে তিনি নির্যাতনের শিকার। এর অর্থ এই নয় যে সেটা অবশ্যই সত্য। যেসব মানুষ ঘটনা অতিরঞ্জিত করতে পারেন, তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। এটা স্পষ্ট করে বলুন যে তাঁদের ঘটনাটা সত্য, এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দূর্ভোগ বা ভোগান্তির বিষয়ে কিছু করা যাবে না। অন্যান্য সাক্ষাৎকারের বেলায় আপনি যেমন কয়েকটি মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে নেন, এমন ক্ষেত্রেও তা করার ক্ষেত্রে অবহেলা করবেন না।


সঠিক প্রশ্নটি করা না করার ওপরে প্রতিবেদন হবে কি হবে না তা নির্ভর করে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে: আপনি কিভাবে সেই গল্পটি পাঠকের সামনে সহজবোধ্য আকারে হাজির করতে পারছেন। একটা আকর্ষনীয় সংবাদ প্রতিবেদন লেখার জন্য আপনি সংগৃহীত তথ্য কীভাবে বাছাই করবেন, তা নিয়ে আলোচনা থাকবে পরের অধ্যায়ে।