আপনি একটি আইডিয়া বা ধারণা পেলেন, আর সাথে সাথেই অনুসন্ধানে নেমে পড়লেন, বিষয়টি এমন নয়। আইডিয়া বা ধারণা শুরু করার একটা জায়গা মাত্র। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে আছে গভীর সামাজিক দায়; আছে নানা ধরণের আইনি ঝুঁকি। একারণে আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে প্রতিবেদনটিকে যেন যথাসম্ভব সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়। গণমাধ্যমে কাজ হয় দলীয় প্রচেষ্টায়, সম্পদও লাগে বেশি। তাই মাঠে নামার আগেই সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ এবং অনুসন্ধানের জন্য আপনার যে ধরণের উপকরণ লাগবে তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আর গল্পের প্রতিটি ধাপ কিভাবে এগোবে, তা আগেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।

অনুসন্ধানের ধারণা কোন উৎস থেকে এসেছে, সেটি আপনার কর্মপরিকল্পনা সাজানোর একটি নিয়ামক। সেই ধারণা যদি আপনার নিজের পর্যবেক্ষণ বা একটিমাত্র ঘটনা থেকে আসে, তাহলে আগে নিশ্চিত হতে হবে, এই অভিজ্ঞতা কি নিছক ব্যক্তিপর্যায়ের, নাকি তা বৃহত্তর কোনও প্রবণতা বা ইস্যুকে তুলে ধরে। যদি এই ধারণা কোনো গোপন সূত্র থেকে আসে তাহলে আপনাকে তার যথার্থতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তথ্যদাতার অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এগুলো সবই করতে হবে কাজ শুরুর আগে। যদি আপনার সূত্র নিখুঁত হয় এবং প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ যদি অকাট্য হয়; তারপরও এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে আপনার আইডিয়াকে একটি শক্ত অনুমান বা হাইপোথিসিসের ওপর দাঁড় করাতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আপনার অনুসন্ধান যার উত্তর খুঁজবে, অথবা যাকে সত্য বা মিথ্য বলে প্রমাণ করবে, সেই প্রশ্নটি আগে ঠিক করে নিতে হবে। অবশ্য প্রাথমিক পর্যায়ের এই পরিকল্পনা যে একেবারে অপরবর্তনীয়, তা নয়। এতে পর্যাপ্ত নমনীয়তা থাকতে হবে যাতে আপনার অনুসন্ধানে নতুন তথ্য বা দিক পাওয়া গেলে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়।

প্রায়ই দেখা যায়, অনুসন্ধান শুরু হয় বিস্তৃত একটি ধারণা নিয়ে, ফলে বড় পরিসরে তার সাথে জড়িত মোটামুটি সব বিষয় খতিয়ে দেখার (এবং সম্ভবত অনিয়ন্ত্রণযোগ্য) পরিস্থিতি তৈরি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা আটলান্টা জার্নাল-কনস্টিটিউশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং স্বনামধন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদক টমাস অলিভার বলেছেন: “অনেক সময় একটি বিষয়ে আপনি যা যা জানতে চান, তার সম্ভাব্য সবকিছু অনুসন্ধানী প্রকল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলার ঝোঁক দেখা যায়। এটা একটা দুর্বলতা, শক্তি নয়।”

আপনার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়া ও উন্নত করার একটা ভালো কৌশল হলো বিষয়টি নিয়ে লিখতে শুরু করা। প্রতিবেদনের একটি সারসংক্ষেপ তৈরির চেষ্টা করুন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন কেমন হবে তা নিয়ে একটি প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলুন। এভাবে বার্তাকক্ষকে আপনার প্রতিবেদন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়া যাবে এবং সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যাও দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমেই আপনি বুঝতে পারবেন – প্রতিবেদনটি স্থানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দাঁড় করাবেন, নাকি তার আঞ্চলিক বা জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলার মত ক্ষমতা আছে। এই পর্যায়ে নীচের প্রশ্নগুলো আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে:

  • > কী ঘটছে? কেন আপনার পাঠক বিষয়টিতে আগ্রহী হবে?
  • > এর সঙ্গে কারা জড়িত? কীভাবে তারা এটা করেছে? এর ফল কী হয়েছে?
  • > কী ভুল/অনিয়ম হয়েছে? কীভাবে এই ভুল/অনিয়ম হয়েছে? এর পরিণতি কী?
  • > খবরটি প্রকাশ হলে কারা সুবিধা পাবেন এবং কারা সমস্যায় পড়বেন? খবরটি প্রকাশ পেলে সমাজের আচরণ বা মূল্যবোধ নিয়ে কি কোনো বিতর্ক হবে? বিশেষ এই খবরটিতে কি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার ত্রুটির বিষয়টি উঠে আসবে?

কীভাবে প্রতিবেদন লিখবেন তা ভাবতে এবং কীভাবে অনুসন্ধান করবেন তার পথ শনাক্ত করতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনাকে সাহায্য করবে।


উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পানি সরবরাহ সেবা বেসরকারিকরণ করার পর কোনও এলাকায় ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে, এমন একটি প্রতিবেদনের কথা। আপনি রিপোর্ট করতে পারেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে না পেরে, মানুষ কীভাবে কোথা থেকে পানি সংগ্রহ করছে (এখানে প্রধান কথা হলো ক্রয়ক্ষমতা)। কিংবা আপনি শোধনাগার পরিদর্শন করে পানি নিরাপদ করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন করতে পারেন (এখানে প্রধান কথা হলো খরচ কমাতে গিয়ে মাননিয়ন্ত্রণে ঘাটতি)। সতর্কভাবে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে প্রতিবেদনের মূল বার্তা চিহ্নিত করা সহজ হয়।

এই সময়ে আপনি আরো দেখবেন: প্রতিবেদনটি সত্যিই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিনা এবং বিভ্রান্তিকর হতে পারে এমন যে কোেেনা ধারণা বাদ দিতে হবে। দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে কেউ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। আপনি যখন আপনার প্রয়োজনীয় সব তথ্য-প্রমাণ পেয়ে যাবেন, তখন এই প্রশ্নগুলোতে ফিরে গিয়ে, আপনি আপনার লেখাকে সাজাতে পারবেন।