সোর্স ম্যাপিং: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে, আপনার প্রতিবেদনের প্রধান চরিত্রগুলোকে সনাক্ত করা এবং তাদের কর্মকা- নথিবদ্ধ করা। অনেক প্রকাশ্য রেকর্ডেই সরকার, হাসপাতালের কর্মী, করপোরেশন, মাফিয়া চক্র বা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। আপনার অনুমান সঠিক কিনা তা যাচাইয়ে অনেক সূত্রই আপনার সহায়ক হতে পারে এবং সেগুলো আপনার অনুমানের সত্য-মিথ্যা নিশ্চিত করতে পারে। প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য যাচাইয়ের জন্য অবশ্যই দুই-সূত্র নীতি অবলম্বন করবেন। তার মানে আপনি একই তথ্য দুটি নিরপেক্ষ সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছেন। এই সূত্রগুলো আপনাকে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপার্ট’ বা পটভূমির বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ যোগাবে। আপনার নোটবুকে সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত ঠিকানা টুকে রাখতে ভুলবেন না।

সূত্র বা সোর্স মূলত দুই ধরণের: প্রাথমিক বা সেকেন্ডারি।

প্রাথমিক সোর্স: এরা আপনাকে একদম প্রত্যক্ষ তথ্যপ্রমাণ দেবে বা সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলবে। যেমন, কোনো রোগী যদি কোনো নার্সের মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ কেনেন, তাহলে সে ওষুধের কালোবাজার সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। অবশ্য নার্সরা দৃশ্যের আড়ালে কী কী কর্মকা- করে, সে ব্যাপারে হয়তো আপনাকে বিস্তারিত বলবে না। কোনো পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্টের জমাদার – যাকে হয়তো প্রতি সপ্তাহের বদলে মাসে একবার পানির বিশুদ্ধতা যাচাই করতে বলা হয়েছে – তিনিও হতে পারেন আপনার প্রাইমারি সোর্স। কোনো মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাব বিবরণীও একটি প্রাইমারি সোর্স। সেখানে হয়তো আন্তর্জাতিক কোনো আগ্নেয়াস্ত্র কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার কথা লেখা আছে। সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করে নিতে পারলে এসব প্রাইমারি সোর্স থেকেই আপনি পাবেন সবচে কার্যকর প্রমাণ। তবে এসব খুঁজে পাওয়া প্রায়ই খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কোনো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত- এমন অনেকেই হয়তো ভবিষ্যতের হয়রানি বা ঝামেলার কথা ভেবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না। অন্যদিকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা হাসপাতালের নথিপত্রের মতো বিষয়গুলো গোপন রাখা হয়, অথবা গেপানীয়তা আইনের কারণে সহজে পাওয়া যায় না।

সেকেন্ডারি সোর্স: এই ক্যাটাগরির মধ্যে থাকবে সব ধরনের নথি: যেমন, সংগঠনের নানারকম রিপোর্ট; বা এমন কোনো ব্যক্তি যিনি ঘটনা নিজে দেখেননি কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শোনা বিবরণ আপনাকে বলছেন (‘আমার এক বন্ধু, যে… ’)। সেকেন্ডারি সোর্সও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো জানাবোঝার জন্য। এখান থেকে আপনি অন্য কোনো সূত্রও পেয়ে যেতে পারেন। তবে সেকেন্ডারি সোর্স থেকে পাওয়া যে কোনো তথ্য খুব ভালোমতো যাচাই করে নিতে হয়।

সোর্সকে আপনি আরো চারভাগে বিভক্ত করতে পারেন: ব্যক্তি, নথি, ডিজিটাল ও গণ (ক্রাউড-সোর্স)।

(ক) ব্যক্তি সূত্র: অনেক সূত্রই এই শ্রেণীতে পড়ে: যারা সরাসরি জড়িত, প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট; এ বিষয়ে আগ্রহী ও অনিচ্ছুক। আপনি যার কাছে তথ্যের জন্য যাবেন, তার অবস্থান, বিশ্বাসযোগ্যতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। আপনি যদি পানি সরবরাহ বেসরকারিকরণ নিয়ে প্রতিবেদন করেন তাহলে বেসরকারিকরণের বিরোধিতাকারী সংগঠন, সংস্থা বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা আপনাকে বিরোধিতার কারণ নিয়ে প্রচুর তথ্য ও জোরোলো যুক্তি বা মতামত দিতে পারবেন। কিন্তু এই তথ্য আসছে নির্দিষ্ট অবস্থানের ব্যক্তিদের কাছ থেকে, সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে, যাঁরা একটি বড় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। সে ক্ষেত্রে যিনি বা যাঁরা সারাংশ হিসেবে তথ্য সরবরাহ করতে পারেন তিনি বা তাঁরা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই গোষ্ঠীর মতামত পরিবর্তন করে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পয়েন্ট বাদ দিয়ে তা আপনার কাছে তুলে ধরতে পারেন। তাই আপনাকে বিস্তৃতভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও সূত্র থেকে তথ্য নিতে হবে। আপনি কোনো জনগোষ্ঠীর মতামত নিতে গেলে আপনাকে বিবেচনা করতে হবে তা যেন পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন: নারী, পুরুষ, তরুণ, বৃদ্ধ, উচ্চ ও নিম্নআয়ের কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার ভিন্নতার দিকগুলোও বিবেচনায় নেওয়া। ব্যক্তি সূত্র আপনার প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে এবং খবরকে জীবন্ত করে তোলে।

(খ) নথি সূত্র: এই সূত্র হতে পারে বই, সংবাদপত্র এবং সাময়িকী, সরকারি দলিল এবং ব্যবসায়িক দলিল, যেমন: চুক্তিপত্র বা ব্যাংক বিবরণী। এটা হতে পারে এমন তথ্য যা গবেষণায় বেরিয়ে আসলেও (‘গ্রে বিষয়বস্তু’) রিপোর্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়নি (যেমন: বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত গবেষণা, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট গবেষণা), অথবা যা সরকারীভাবে বা আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন রাখা হয়েছে। তবে নথিপত্র খোঁজার (পেপার ট্রেইল) কিছু চ্যালেঞ্জও আছে: কখনো কখনো আমরা জানতেই পারি না যে প্রমাণ সত্যি আছে নাকি নেই। নথি থাকলেও সেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে দুর্বল নথি ব্যবস্থাপনার কারণে; কোথাও কোথাও তথ্য অধিকার আইন নেই বলে আবেদন করেও সেটি পাওয়ার সুযোগ থাকে না; আবার তথ্যটি প্রকাশিত হলে প্রতিষ্ঠান বা সরকার সমস্যায় পড়বে ভেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নথি পাওয়ার পথে বাধাও সৃষ্টি করতে পারেন। তাই আপনি যে বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন সে বিষয়ে কোথায় কী নথি থাকতে পারে, সেসব নথি কোথায় কীভাবে রাখা হয়েছে এবং কীভাবে এই নথিগুলো পাওয়া যেতে পাওে – এগুলো খুঁজে বের করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় প্রাথমিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নথি পাওয়ার জন্য যদি কোনো কর্মকর্তার আগাম অনুমতি প্রয়োজন হয়, তাহলে গবেষণা শুরুর পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব এই আবেদন করতে হবে। কারণ কর্মকর্তার অনুমতির পরও নথি পেতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে।

(গ) ডিজিটাল সূত্র: ডিজিটাল সূত্র হলো যে তথ্যগুলো ওয়েবে এবং ডিজিটালি সংরক্ষিত রেকর্ডস থেকে পাওয়া যায়। অনলাইনে যে বিপুল পরিমাণে তথ্য পাওয়া যায় তা বিস্ময়কর। তবে অন্য সূত্রের মতোই এসব সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। আপনাকে যাচাই করে নিতে হবে তারা নিজেদের বিষয়ে কী লিখেছে এবং পরিবার ও বন্ধুরা তাদের কীভাবে তুলে ধরছে। মনে রাখতে হবে যে, ওয়েব প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। যে কেউ যে কোনো বিষয় ওয়েবের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করতে পারে, যার মধ্যে পুরোপুরি বিকৃত তথ্যও থাকতে পারে। এ ছাড়া অনলাইনে একই তথ্য অনেকদিন ধরে একই অবস্থায় থাকতে পারে, কিন্তু দেখা গেছে কিছুদিন পর সে তথ্যগুলো তামাদি হয়ে যায়। প্রথমে আপনাকে অবশ্যই সবচেয়ে হালানাগাদ তথ্য খুঁজতে হবে। আরও সাহায্যের জন্য আপনি ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টারের (ইজেসি) ভেরিফিকেশন হ্যান্ডবুকের কপি বিনামূল্যে ডাউনলোড করে নিতে পারেন। এতে কিছু টুলস রয়েছে যা আপনাকে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের পদক্ষেপগুলো র্বিস্তারিতভাবে নির্দেশ করবে।

(ঘ) গণ সূত্র: ক্রাউড সোর্স নামে বহুল পরিচিত নতুন এই টুল ব্যক্তি ও ডিজিটাল সূত্রের মিশেল ঘটায়। এতে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পাঠক-দর্শককেও অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। যেমন, টুইটারে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা বা কোনো ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা।

সূত্রের ধরনকেন দরকারশক্তিসম্ভাব্য সমস্যা
ব্যক্তিপ্রতিবেদনে প্রাণসঞ্চার করে এবং সত্যতা নিশ্চিত করেসাক্ষাৎকারের জন্য উচ্চতর প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়না

সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা প্রতিবেদনকে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে
মানুষের পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে, পূর্বধারণা থেকে বলতে পারে, এমনকি মিথ্যাও বলতে পারে।

প্রমাণ পাওয়া যায় না এমন তথ্য দিতে পারে (সূত্রের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করুন)

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য তথ্যদাতা নিপীড়নের শিকার হতে পারেন (কীভাবে তাঁকে সুরক্ষা দেওয়া যায় তা ভাবতে হবে)
নথিশক্ত প্রমাণ দেয়

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট মেলে
সেকেন্ডারি সূত্র থেকে আপনি যতটা প্রেক্ষাপট পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য যোগাবে

প্রাথমিক সূত্র হিসাবে যেমন (ব্যাংক রের্কড) নথিবদ্ধ এবং অকাট্য প্রমাণ
সেন্সরশীপ বা ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা আইনের বাধা থাকতে পারে। তথ্য পাওয়া তাই সময় সাপেক্ষ বা কঠিন হতে পারে

তথ্যগুলো বুঝতে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন হতে পারে।

মৃতব্যাক্তির বক্তব্য বা তত্ত্বনির্ভর (অ্যাকাডেমিক) প্রতিবেদন হতে পারে, যাতে জীবিত কারো কথা না থাকায় সেটা প্রাণবন্ত নাও হতে পারে।
ডিজিটালকী জোগাড় করা গেল তার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু, ওপরের সবকিছু হতে পারে। সবকিছুই আপনার কম্পিউটারের মাধ্যমে করা যায়, যুক্ত করতে পারেন অডিও-ভিডিও

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে খুব দ্রুত এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য পোস্ট করার সম্ভাবনা থাকায় তা সহজলভ্য।
প্রতিবেদনটির বিষয় তামাদি হয়ে গিয়ে থাকতে পারে।

ইন্টারনেটে তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে

ইন্টারনেটে থাকা গুজব ও ভূয়া তথ্য যাচাই কঠিন হতে পারে।

আপনার অনুসন্ধানের জায়গায় হয়তো তথ্য পাওয়ার জন্য কোনো আইন থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশের আইনগুলোর নামে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি উপাদানের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা রয়েছে। যেকারণে এসব আইনগত বিষয়ে অভিন্ন বৈশ্বিক পরামর্শ দেওয়া কঠিন। তবে অনুসন্ধান শুরুর আগে আপনার দেশের আইন নিয়ে কিছু গবেষণা করে নেওয়া আবশ্যক।