প্রায় সব বিষয়েই বিশেষজ্ঞ রয়েছে: ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞান গবেষক, আইনবিদ, প্রকৌশলী এবং আরও অন্যান্য। বাণিজ্যিক বিষয়াদি (যেমন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম) নিয়ে কাজ করার সময় সঠিক বিশেষজ্ঞ চিহ্নিত করা বিশেষভাবে জরুরি। তিনি হতে পারেন এমন কেউ, যিনি ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এ ধরনের বিশেষজ্ঞ আপনার অনুসন্ধানে বিশেষ সহায়ক হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ওই বিশেষজ্ঞ কীভাবে তাঁর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং যে বিষয়ে আপনি অনুসন্ধান শুরু করেছেন, তার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন কি না, তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরাও আপনার সামনে হয়তো পরিপূর্ণ একটি চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম। যেমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে মানবাধিকারকর্মীর মতই একজন আইনজীবী, একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন চিকিৎসক কিংবা একজন জিজ্ঞাসাবাদকারীও বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারেন।

তবে, সব বিশেষজ্ঞই একই মানের কিংবা একই রকম নির্ভরযোগ্য নন। কাজেই এ ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বস্ত অন্য সাংবাদিকদের পরামর্শ নিন, তার কর্মকা- ও যোগ্যতা সম্পর্কে খোঁজখবর করুন। জানার চেষ্টা করুন, কাদের জন্য তারা গবেষণাটি করেছেন। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে গবেষণাকারী বিজ্ঞানীরাও তদবিরকারীদের মতো হতে পারেন। তাদের কাজের কারণে কী কী বিতর্ক বা সমালোচনা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করুন। এমনকি নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের (অথবা বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন) সম্পর্কেও প্রশ্ন করা প্রয়োজন। যদি বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ একমত না হতে পারেন, তাহলে ভিন্নমতগুলো একসঙ্গে উপস্থাপনের উপায় খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে, যা থেকে পাঠক একটা ধারণা পেতে পারেন। আর যদি বিশেষজ্ঞদের মতামত একদিকেই যায়, তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ আপনি গ্রহণ করতেই পারেন। তবে, এরপরও আপনি ভুল প্রমাণিত হতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা যখন সমানভাবে বিভক্ত, তখন তা পাঠকের কাছে ব্যাখ্যা করা আপনার দায়িত্ব। তবে আবারও বলছি, আপনাকে অবশ্যই এসব বিশেষজ্ঞদের কর্মকা- ও যোগ্যতা সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর করতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে যাতে মনে হয় বিশেষজ্ঞরা সমানভাবে বিভক্ত। কিন্তু পরে যখন প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করা হলো, তখন জানা গেল যে অনেক ‘বিশেষজ্ঞই’ জ্বালানিখাতের মুখপাত্র হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিষয়টিকে নাকচ করে গেছেন । বাস্তবতা হলো, বহু বছর ধরে অনেক বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ মিলেছে যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে এবং তা বিপজ্জনক।

সরকারি বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদেরও খুব ভালোভাবে পর্যালোচনা করুন ও সন্দেহ নিয়ে দেখুন। অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মতো সরকার নিয়োজিত বিশেষজ্ঞও ভুল বা সঠিক হতে পারেন। কখনো কখনো তারা সরকারের চাপে বিশেষভাবেও তথ্য উপস্থাপন করেন। বিশেষজ্ঞ নয়, এমন তথ্যদাতার দেওয়া তথ্য যেভাবে যাচাই করা হয়, এই বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যও সেভাবে দ্বিতীয় সূত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে নিতে হবে। সরকারি দপ্তরের কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবেও জানতে চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে হয়তো প্রতিবেদনে সূত্র হিসেবে তার পরিচয় উল্লেখ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি অনেক তথ্য পেয়ে যেতে পারেন।

আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধু লিখিত প্রতিবেদন ও নীতিমালার উৎস। কিন্তু, তারা যে দেশে তাদের সদর দপ্তর এবং যেসব দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, এমন সব জায়গায় দরকারি যোগাযোগের সূত্রও দিতে পারে। আপনাকে সহযোগিতা করতে তাঁরা বাধ্য নন। কিন্তু, যথাযথভাবে যোগাযোগ করতে পারলে, বিশেষত: অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর বিষয়ে তাদের যদি জোরালো আগ্রহ থাকে, তাহলে প্রায়শই এসব সংস্থা সহানুভূতি দেখায়। গবেষণার মাধ্যমে আপনি তাঁদের মন্তব্য ও তথ্যের পটভূমি পাবেন, কিন্তু ভারসাম্যের প্রয়োজনে আপনাকে অন্য কোনো উৎস থেকেও সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

কখনো কখনো আপনি নিজের কাজের বিষয়বস্তু বা আপনার সুনির্দিষ্ট তথ্যের কথা জানিয়েও সূত্রের সন্ধান করতে পারেন। আপনি এ কাজ অনানুষ্ঠানিকভাবে, নেটওয়ার্কে থাকা সূত্রদের কাজে লাগাতে পারেন; কখনো কখনো অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর ওপর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অনেকেই হয়তো আপনাকে ইমেইলে বা টুইটের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানাতে পারে। অথবা আগে তথ্য দিতে রাজি হয়নি এমন সূত্র আপনার প্রতিবেদন ‘শুধরে’ দিতে আগ্রহী হতে পারে। ভালো-মন্দ; সব দিক বিবেচনা করেই আপনাকে কৌশল ঠিক করতে হবে। কারণ কখনো কখনো এমন পদ্ধতিতে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। আপনি যাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে চান, তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্ট বা লুকানোর চেষ্টা করতে পারে, তথ্যদাতাদের মুখ বন্ধ কিংবা আপনার বিরুদ্ধে আগাম কোনো পদক্ষেপ নিয়ে বসতে পারে!

প্রতিবেদনের জন্য বিশেষজ্ঞ খুঁজে না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি আর অগ্রসর হতে পারবেন না। আপনি ভুল হতে পারেন – অথবা আপনি হয়তো ভুল বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে থাকতে পারেন, কিংবা আপনার প্রশ্নটা ভুল হতে পারে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরণের মত থাকলে তাতে মুক্তমনেরই প্রকাশ ঘটবে এবং তা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অন্য বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।