অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যেসব দেশে স্বৈরশাসন চলছে, আইনের শাসন দূর্বল এবং সাংবাদিকেরা গ্রেপ্তার বা হত্যাকান্ডের শিকার হতে পারেন। কাজেই কখনো কখনো গোপনে কাজ করাটা জরুরি। প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সূত্রকে সতর্ক করা আপনার দায়িত্ব। সেই সঙ্গে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হলে সমাজের লাভ ও জনস্বার্থ সম্পর্কেও তাকে জানাতে হবে। এসব বিষয়ে আলোচনার পরই কেবল আপনি বলতে পারেন যে সূত্র ‘সজ্ঞানে’ নাম প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। ইমেইলে বা ফোনে যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সূত্র ঠিকঠাক বুঝেছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হতে হবে।

যেখানে আড়িপাতা, ফোনকল রেকর্ড করা বা ইমেইল হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে সূত্র সংশ্লিষ্ট কোনো কিছু আলোচনা করবেন না। মনে রাখতে হবে, মুঠোফোনের কলসহ ফোনরেকর্ড পাওয়া এবং আপনার অবস্থান শনাক্ত করা খুব সহজ। গোপন কোনো সাক্ষাতে যাওয়ার আগে আপনার মুঠোফোন বন্ধ করে তার ব্যাটারি বের করে ফেলুন। সূত্র সম্পর্কে তথ্য রয়েছে এমন কোনো নোট নিরাপদ জায়গায় রয়েছে, তা নিশ্চিত করুন; অথবা তৃতীয় কারও কাছে রাখতে পারেন, যিনি আপনার অনুসন্ধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।

প্রভাবশালীদের অপরাধ, কথার ঘোরপ্যাঁচ, মিথ্যা ও ভুল তথ্য মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমন সূত্র খুঁজে বের করা যিনি রাখঢাক না করে আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। তেমন সূত্র খুঁজে পেতে আপনার সময় লাগবে। যদিও আপনি কথা বলতে বা আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জানাতে কাউকে জোর করতে পারেন না। তাদের সংশয়ের কারণ আপনাকে বুঝতে হবে; বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভয় পাবেন না। একটি ভালো প্রশ্ন হতে পারে: ‘আপনার নাম যদি প্রকাশ পায়, তাহলে কী হতে পারে?’ কখনো কখনো ভয়টা ব্যক্তিগত; সূত্র যদি অনিবন্ধিত অভিবাসী হয়ে থাকে তাহলে তার পরিচয় প্রকাশের পরপরই তাকে বিতাড়ন করা হবে; একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়তো বরখাস্ত, এমনকি গ্রেপ্তারও হতে পারেন; এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো সমাজের অন্যদের আক্রমণের শিকার হবেন। তথ্য আদানপ্রদানের আগে সূত্রের কাছে ব্যাখ্যা করুন যে অন্য কারও কাছে হয়তো তাদের পরিচয় আপনাকে জানাতে হবে। ব্যাখ্যা করুন, কীভাবে আপনি তাদের অবস্থান, অতীত ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান, এমনকি লিঙ্গসহ যাবতীয় পরিচয়ের কথা গোপন রাখবেন। সূত্র কোনো তথ্য বা পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করলে বা কোনো অংশ অনানুষ্ঠানিক বা অফ দ্য রেকর্ড দাবি করলে তার সে অনুরোধ মেনে নিন; অনানুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া তথ্য যে শুধু পটভূমি ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হবে সেবিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করুন। তাঁকে বোঝাতে হবে যে আপনার সম্পাদক ও অন্য যে সহকর্মীরা প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট হবেন, তাঁরাও বিষয়টি বুঝবেন। আপনার সম্পাদক হয়তো সূত্রের নাম প্রকাশ করতে বলবেন। আপনি যখন এটি করবেন, পুরোপুরি পরিষ্কার করুন যে এই তথ্য সম্পাদকের কার্যালয়ের বাইরে যাবে না। প্রতিবেদক ও সূত্রের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি। পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি কাউকে দিয়ে থাকলে আপনাকে অবশ্যই সে প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে; এমনকি যদি তার পরিণতিতে কারাবরণ করতে হয়। তবে আগেভাগেই সূত্রকে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেবেন না যা আপনি রাখতে পারবেন না; প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারার কারণে কোনো সূত্রের নির্যাতন বা মৃত্যুর নৈতিক দায়বদ্ধতা বহনের চেয়ে অজ্ঞাত বা গোপন সূত্রের তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি অপেক্ষাকৃত ভালো।

মনে রাখতে হবে, অনেক দেশে সূত্রের নাম-পরিচয় জানতে প্রতিবেদক ও সম্পাদকদেরও নির্যাতন করা হয়। যেহেতু এসব দেশে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ফৌজদারি আইনে বিচার হয়, কাজেই বিচারে সূত্রের নাম প্রকাশের নির্দেশ আসতে পারে, এবং এই নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানানোর অর্থ আদালতের কাজে বাধা বা আদালত অবমাননার মতো অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে, আর তা হলে কারাদন্ড হতে পারে। কাজেই সূত্রকে রক্ষায় আপনি কত দূর পর্যন্ত যেতে পারবেন, তা অনুসন্ধান শুরুর আগে নির্ধারণ করে নিতে হবে।

“নিজের একটি সূত্র খুন হওয়ার ঘটনা সাংবাদিক হিসেবে আমার জন্য সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা। কারণ ওই সূত্র আমাকে যত তথ্য দিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য তাঁর নিজের কাছে ছিল। কিন্তু তিনি একটু প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাদের সঙ্গে কাজ করতেন, তাদের বুঝে উঠতে সমস্যা হয়নি এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। কাজেই সূত্র হিসেবে আপনার এলামেলোভাবে বা টুকরো টুকরোভাবে তথ্য দেওয়া উচিত নয়, যাতে আপনাকে মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। তার চেয়ে বরং নিজের নাম ব্যবহার করে ঝুঁকি নেওয়া ভালো, যাতে আপনার কিছু হলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায় আপনার তথ্য ফাঁসের কারণে ( হুইসেলব্লোয়িং) তা ঘটেছে। সূত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার এটি আরেকটি পদ্ধতি।” – স্যাম সোল, মেইল অ্যান্ড গার্ডিয়ান, জোহানেসবার্গ।

সূত্রের পরিচয় গোপন রেখে প্রতিবেদন তৈরির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সূত্রকে রক্ষা করা। অজ্ঞাত সূত্রকে পর্যবেক্ষণে রাখা কঠিন, এর মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন উৎসাহিত হয় এবং নিশ্চিতভাবেই প্রতিবেদনে পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে। তবে অতিরিক্ত স্বাক্ষ্যপ্রমাণকে এ ধরনের সূত্রের প্রত্যক্ষ বিবরণ, ভেতরের খবর, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে, কিংবা সেদিকে পথ দেখাতে পারে। কাজেই পরিস্থিতির নিরিখে সূত্র ও প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করুন। প্রতিবেদনে আপনি সূত্রকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, সে ব্যাপারে তার সঙ্গে সমঝোতায় আসুন এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তাঁদের বর্ণনা যতটা সম্ভব স্পষ্ট করুন। ‘একজন বিজ্ঞানীর চেয়ে বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করা একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী’ বিবরণটি অপেক্ষাকৃত ভালো- যদি না ওই মন্ত্রণালয়ে তিনিই একমাত্র পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করে থাকেন।