বেশির ভাগ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গুণগত হয়। কেন ও কীভাবে অনিয়ম হয়েছে এবং কারা দায়ী হতে পারে, তার খোঁজ পাওয়া যায় এ ধরণের প্রতিবেদনে। তবে, তাতে সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যও থাকে। যেমন: ঘাটতি কত বড়? আপনার দেশে অবৈধ মাছ শিকারের পরিসংখ্যান কী? স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর কতজন রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়?

এর অর্থ, ছোট থেকে বড় সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়, তা আপনাকে জানতে হবে। সেই সঙ্গে জানতে হবে খুব সাধারণ কিছু গণনার মাধ্যমে শতকরা হারে সংখ্যার উপস্থাপনকে কীভাবে গুরুত্ববহ করে তুলতে হয়। সংখ্যাকে ভালোবাসার কারণেই যে বেশির ভাগ মানুষ সাংবাদিক হন, তা নয়। তবে সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য জটিল কিছু নয়। বাস্তবতা হলো, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এটি জরুরি।

আপনি মৌলিক তথ্য বোঝার মাধ্যমে কাজটা শুরু করবেন। যেমন, আপনি যদি কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নার্সের দাপ্তরিক কাজের বিবরণ ও কর্মদক্ষতা যাচাই করতে চান, তাহলে একজন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে পারেন। তিনি আপনাকে এই পেশার কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের একটি কালক্রম তৈরি করে দিতে পারবেন। এরপর পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আপনি আরো যা যা খুঁজে পেতে পারেন:

  • > কোন কাজে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়? নার্সরা কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে বিকল্প কিছু করেন কি না? সেই বিকল্পগুলো কি? নার্সদের ওপর কি কর্মঘণ্টার মধ্যে অনেক বেশি দায়িত্ব পালনের চাপ সামলাতে হয়?
  • > কতজন রোগীকে সেবা দিতে হবে, তার সঙ্গে একজন নার্সের কাজের বিবরণের সম্পর্ক কীভাবে নিরূপন করা হয়? একজন রোগীকে সেবা দিতে কত সময় লাগে?

একইভাবে, আপনার যদি বাতাসের নমুনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়, তাহলে বাতাসে দূষণ সৃষ্টিকারী কী কী উপাদান রয়েছে, তা জেনে নিয়ে আপনি একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন, এসব উপাদান বিপজ্জনক কি না এবং বাতাসে এগুলোর মাত্রা কত হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিজের দেশের নিরাপদ বায়ু বিষয়ক আইন-কানুন ও নীতিমালার সঙ্গে বাতাসে থাকা উপাদানের মাত্রা তুলনা করুন। আপনি হয়তো তখন জানতে পারবেন, এ সমস্যা শুরু হয়েছে অনেক আগে এবং এরপর পরিস্থিতি খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অথবা জানতে পারেন, এ ধরনের দূষণজনিত সমস্যা প্রায়শ ঘটছে অথবা বাতাসে এগুলোর মাত্রা আগে যতটা থাকতো, এখন তার চেয়ে কম। সাংবাদিকের কাজ হলো এসব সংখ্যার ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ঠিক কখন থেকে এ সমস্যা বড় হয়ে উঠলো বা সবার নজরে এল, তা তুলে ধরা। তবে সংখ্যাই সব কথা নয়। এখন কেন এ সমস্যা লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠল- সে পটভূমিটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং হয়তো সেটাই আপনার প্রতিবেদনের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

বেশির ভাগ দেশে আবহাওয়া পরিসংখ্যান হলো সবচেয়ে বড় সংখ্যাগত রেকর্ডের অন্যতম। যেমন, আফ্রিকায় উপনিবেশিক যুগে কর্তৃপক্ষ তথ্যের প্রথম যে সংগ্রহ গড়ে তুলেছিল, তার মধ্যে আবহাওয়ার পরিসংখ্যান একটি। এমনকি সমাজে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ইতিহাস থেকে ওই সময়েরও আগে বন্যা ও খরার তথ্য পাওয়া যায়। এশিয়ার অনেক দেশেই আবহাওয়ার তথ্য সংবলিত ডেটাবেস রয়েছে, যেখানে আবহাওয়ার ধরন বিষয়ক নথি পাওয়া যাবে। আপনি হয়তো আপনার দেশে ঘটে চলা জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও খরা আসলেই অভূতপূর্ব কি না, তা জানতে অনুসন্ধান করতে চাইবেন। এ ক্ষেত্রে আপনি আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রবণতা বিষয়ক তথ্যগুলো তুলনা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন।

এটি আমাদের নিয়ে যায় আরেকটি জায়গায়: ডেটা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আর এখান থকে আপনি নতুন নতুন ধারণা পেতে পারেন। যেমন, প্রেস রিলিজে থাকা পরিসংখ্যান কেউ খুব একটা যাচাই করে না। যারা সেটি লিখছেন, তারাও আশা করেন না কেউ প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রায়ই আলোড়ন সৃষ্টিকারী সব প্রতিবেদনের জন্ম দেয়। ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা কোনো সম্ভাব্য খবরের সূত্রই হাতছাড়া করেন না। একইসঙ্গে সংখ্যা, রেখাচিত্র এবং/অথবা সংখ্যাতাত্ত্বিক অন্যান্য তথ্যের ক্ষেত্রে সন্দেহপ্রবণ হওয়া উচিত। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এই ডেটাগুলো দিয়ে দারুন একটি মৌলিক প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে। কিন্তু ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এসব পরিসংখ্যানের উৎস ভালোভাবে জানার চেষ্টা করা উচিৎ। যেমন, জরিপটা কীভাবে চালানো হলো, নমুনাগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হলো, কে অর্থায়ন করেছে, কে প্রকাশ করেছে, কিংবা সেটি প্রকাশকারীরা নিজেদের স্বার্থে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিয়েছে কি না?

প্রেক্ষাপট খুবই গুরুত্বপূর্ণ: শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে কোনো অর্থ তৈরি হয় না। সাংবাদিক হিসেবে, ব্যাখ্যা ও প্রশ্ন করার মাধ্যমে আপনি সেখানে অর্থ যোগ করেন।