আমরা দাপ্তরিক মুখপাত্র ও তদবিরকারীদের ‘মুখপাত্র বা স্পিন ডক্টর্স’ বলে থাকি: তাঁরা তাঁদের নিয়োগকর্তার স্বার্থ হাসিলের জন্যই বেতন পান এবং নানা ঘটনায় সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেন। তবে এসব মুখপাত্রকে চিহ্নিত করা সবসময় সহজ নয়। মন্ত্রীর তথ্য কর্মকর্তা অবশ্যই এমন একজন। কিন্তু সেই সব সাংবাদিকের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা বিশেষ উদ্দেশ্য বা দলের প্রচার-প্র্রসারের জন্য গোপনে অর্থ পেয়ে থাকেন। সরকারি বা বাণিজ্যিক সূত্র বা কর্মকর্তাদের গোপন ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে কী বলা যাবে? অথবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া ‘বিশেষজ্ঞ’ যাঁরা কোনো বিশেষ পণ্যের প্রসারে কাজ করেন? এবং বেনামে কোনো অপরিচিত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন বা খবর? ছোট-বড় যে কোনো কারণে এসব মুখপাত্রকে ব্যবহারের হার দিনে দিনে বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, উপসাগরীয় যুদ্ধের বিষয়ে জনমত নিজের পক্ষে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছিল এবং ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী গর্বের সঙ্গে নিজেকে ‘তথ্য যোদ্ধা’ হিসাবে নিজের পরিচয় দিতেন।

তবে, ভুয়া খবর নিয়ে কাজ করার চেয়ে একজন স্বীকৃত মুখপাত্রের সঙ্গে কাজ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আপনি জানেন যে মন্ত্রীর মুখপাত্র সমস্যার ওপর রং চড়িয়ে অর্জনের ওপর আলোকপাত করার জন্যই বেতন পান। কেবল সবচেয়ে অদক্ষরাই মিথ্যা বলেন, কারণ সামান্য গবেষণা বা খোঁজ-খবরেই মিথ্যা ধরা পড়ে যায়। প্রাথমিক গবেষণায় গভীরতা এবং ভালো সাক্ষাৎকার কৌশলের মাধ্যমে ফাঁকি ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টাগুলো ধরে ফেলা যায়। মনে রাখতে হবে, মুখপাত্ররা কেবল তাঁদের কাজটাই করছেন, যেমনটা আপনি করছেন।

সরকারি মুখপাত্রদের পাশাপাশি সরকার এবং কিছু বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কিছু গোয়েন্দা শাখাও থাকে, যারা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এবং কখনো কখনো নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে গোপনে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর গল্প প্রকাশ করেছিল, পরে জানা যায় যা তাঁর কাছে ছিল না।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোয় সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের জন্য আলাদা একটা বিভাগ থাকে , যাঁদের নিয়মিত কাজের একটি অংশ হলো গণমাধ্যমে ‘গল্প’ গেলানো। তারা প্রায়শ সাংবাদিক কী জানে, তা জানতে গোয়েন্দাগিরি করে, এমনকি তাদের নিয়োগ দেওয়ারও চেষ্টা করে। তবে কখনো কখনো তারা নিজেদের পছন্দের দিকগুলো পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের তথ্য দেয়, ফেল পাঠকদেরও তা-ই পড়তে হয়। কাজেই কেউ যখন গুরুত্বপূর্ণ অডিও রেকর্ড ও নথি দিয়ে ‘সাহায্য’ করতে আগ্রহী হন এবং তাঁদের আচরণ বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও খুবই সতর্ক হতে হবে।

১৯৮৮ সালে প্যারিসে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতিনিধি ডালসি সেপ্টেম্বরের খুনের ঘটনা অনুসন্ধান করেছেন ফোরাম ফর আফ্রিকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ইভলিন গ্রোয়েনিঙ্ক। এ ঘটনায় ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের ভূমিকা আড়াল করতে সংবাদপত্রে অনেক ভুয়া খবর ছাড়ে। তাতে দাবি করা হয়, বিদেশি ঘাতকেরা ডালসিকে হত্যা করেছে। গ্রোয়েনিঙ্ককে আশ্বাস পেয়েছিলেন, তাকে “এক ফরাসি অস্ত্র ব্যবসায়ীর কথাবার্তার ৩০০ ঘন্টার টেপরেকর্ড” দেয়া হবে। সেই অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে প্রতারণার শিকার হওয়া এক ব্যক্তি এই আশ্বাস দিয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যমের কাছে ওই সূত্রের মুখ খুলতে চাওয়ার যৌক্তিক কারণ ছিল: প্রতারিত হওয়ার পর প্রতিশোধের আকাক্সক্ষা। কিন্তু গ্রোয়েনিঙ্ক যখন কথিত প্রতারণার শিকার ব্যাক্তির বিপুল অর্থ, সময়, নজরদারি করার সুযোগ, উড়োজাহাজের টিকিট ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক নিয়ে তাকে প্রশ্ন করতে থাকলেন, তখনই তিনি লন্ডনে আত্মগোপনে চলে যান। তিনি লন্ডনেরই বাসিন্দা ছিলেন। গ্রোয়েনিঙ্কের সন্দেহ – সূত্রটি আসলে যুক্তরাজ্য সরকার বা দেশটির অস্ত্র নির্মাণ শিল্পে কাজ করতেন।

মোটাদাগে নিয়ম হলো, সূত্র আপনাকে খুঁজে বের করার চেয়ে আপনি সূত্রকে খুঁজে বের করা ভালো। ধরা যাক, পরিচয় না জানিয়ে কেউ গোপনে দেখা করতে বলেছে আপনাকে। শর্ত দিয়েছে, তৃতীয় কাউকে সাক্ষাতের বিষয়ে কিছু বলা যাবে না, কারণ ‘শত্রুপক্ষ তাঁর পেছনে লেগে আছে’। এমন ক্ষেত্রে ওই সূত্র ‘শত্রুপক্ষেরই’ কেউ একজন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি! আপনি প্রায়ই এমন সব মানুষ পাবেন, যারা আপনার সঙ্গে কথা বলতে অনিচ্ছুক এবং শর্ত জুড়ে দেবে যে তারা যা-ই বলুক না কেন, তা অনানুষ্ঠানিক (অফ দ্য রেকর্ড) কিংবা তাঁদের নাম প্রকাশ করা চলবে না। এমন ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই যে কোনোভাবে ওই সূত্রের পরিচয় জানতে হবে। সূত্রের অতীত ইতিহাস যদি আপনার ভালো করে জানা না থাকে, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন না তারা কী ধরনের তথ্য দেওয়ার সামর্থ রাখে।